অরুন্ধতী রয় এর লেখা “মাদার ম্যারি কামস টু মি” বইয়ের রিভিউ-Book review of Arundhuti roy’s “Mother marry comes to me “

একজন শিশু যদি ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে তার শৈশব কেমন হতে পারে, কতটা যন্ত্রণার সেটা বোধহয়

না লিখেও, মুখে না বলেও অনুভব করা যায়। যে সময় শিশুটার সবার ভালোবাসা পেয়ে বেড়ে ওঠার কথা, এবং

এমন কি যে সময় সন্তানরা তার সব থেকে কাছের মানুষ মায়ের ভালবাসা পেতে চায় সেই সময় এই মানুষ টা বঞ্চিত ছিল এর ভালোবাসা থেকে, তার প্রিয়জন দের থেকে।

যার শৈশব কেটেছে এতোটা অবহেলায় তার জীবনটা ঝড়ে যেতে পারতো, নষ্ট হয়ে যেতে পারতো, তা তো হয়নি বরং

সে হয়েছে ভারতের শ্রেষ্ঠ লেখিকা দের একজন। পেয়েছেন বই এর জগতে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বুকার প্রাইস।

নিজের প্রকাশিত বই হাতে নিয়ে অরুন্ধতী রয় (image source google images)

এই সব কথা যে মানুষটাকে নিয়ে বলছি সে আর কেউ না বিখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রয়। নিজের জীবন নিয়ে লেখা তার বিখ্যাত বই”mother marry comes to me”নিয়েই আজকে কথা বলবো তোমাদের সাথে।

অরুন্ধতীর ছোটবেলা?

এই অংশে আমরা কথা বলবো  অরুন্ধতীর রয় এর বিপন্ন শৈশব সমন্ধে। এক কথায় এই বই কে অরুন্ধতী রয় এর  আত্ম জীবনই বলা চলে যেটা আগে বললাম।https://dcbookstore.com/books/mother-mary-comes-to-me

আমরা দেখি অরুন্ধতির মা মেরি অরুন্ধতি আর তার ভাই কে নিয়ে মাতাল বাঙালী স্বামীর ঘর ছেড়ে কলকাতা থেকে তামিল নাড়ুর উটিতে ফিরে আসে এবং

একরকম নিঃস্ব অবস্থায়  মেরি আশ্রয় নেন পৈতৃক এক কামরার একটা ঘরে। যে ঘর ছিল পুরোনো দিনের আর তার পতঙ্গ বিশারদ দাদুর  পুরোনো সব কাগজে ভরা একটা ঘর।

এরপর শুরু হয় মেরির অ্যাজমা।অ্যাজমার কষ্ট যেন মেরি কে অসম্ভব শারীরিক যন্ত্রনা দিচ্ছিল। সেই যন্ত্রনাই যেন একরম রাগ হয় আসতো ছোটো অরুন্ধতি আর তার ভাই এর উপর।https://thebookscope.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%a4-%e0%a6%b8%e0%a7%88%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87/

এরপরে আসে অরুন্ধতির ঠাকুমা আর মামা। যারা ওদের  ওই টুকু থাকার জায়গা ও কেড়ে নিতে চাইছিল। নিয়ম মতো সিরিয়ান ও ক্রিশ্চান পরিবারের মেয়েরা সম্পত্তির

অধিকার পায়না। তাই হয়ত মেরি কে পথে বসানোর চেষ্টা।কিন্তু তামিলনাড়ুতে নির্দিষ্ট আইনথাকায়  অরুন্ধুতির ঠাকুমা, ও আর মামার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব হয়নি। যদিও

এরপরে  স্বাস্থ্যের কারণে আর আর্থিক সমস্যায় মেরিকে তার দুই সন্তান কে নিয়ে শেষমেষ পিত্রালয় কেরলে ফিরতে হয়। এবং

সেখানে কোট্টায়ামে রোটারি ক্লাব এর ঘর নিয়ে মেরি আরম্ভ করেন তার স্কুল। এখানেও  অরুন্ধতি, আর তার থেকে বয়সে বড়  ভাই কে তার মায়ের হাতে নিগৃহিত, তিরস্কৃত, অপমানিত হতে হত। কিন্তু

এত কিছুর পরেও সে নিজের মা কে সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসে গেছে অরুন্ধতী।মায়ের হাঁপানির টান উঠলে দ্বিতীয় ফুস ফুস এর মত মায়ের সেবা করেছে ।

A photo from the 1990s. The photo shows a young girl, Arundhati, sitting next to her mother, with her hand on her shoulder. Her mother is sitting in a chair, and Arundhati is sitting right next to her.
ভালোবাসা
মা মেরির সাথে অরুন্ধতী (ইমেজ source: google images)

মায়ের প্রতি এত ভালবাসা সত্ত্বেও একটা সময় নিজেকে রক্ষা করার জন্য লেখিকা মায়ের কাছ থেকে  পালিয়ে যান। লেখিকা তার বইতে বলেছেন ,১৬ বছর  বয়সে দিল্লীর স্কুল অফ আর্কিটেকচার এ ঢোকার পর

সাত বছর মায়ের সঙ্গে দেখা করেন নি তিনি মাও মেয়ের কোন খোঁজ খবর রাখেননি,এমন কি অরুন্ধতীর ভাইও বোন কে

খুঁজে পাননি যদিও পরে “ইন্ডিয়া টুডে”তে অরুন্ধতীর লেখা একটা প্রবন্ধে ফোন নাম্বারের উল্লেখ দেখে তার বোনের সাথে যোগাযোগ করে।

ভারতের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে পরিবারের ভিতর বাবা মায়ের হাতে সন্তান এর নিগ্রহ  মাঝে মাঝে শোনা যায়।

কিন্তু ভাবতেও কঠিন লাগে যে একটা শিশুর কাছে তার প্রিয় পরিবার যখন ভালোবাসা আর আশ্রয় এর বদলে অত্যাচারের কারাগার হয়ে ওঠে,

তখন পালিয়ে যাওয়া ছাড়া তার কাছে আর কোন উপায় থাকে না।একদম খালি হাতে, কোনরকম সাহায্য ছাড়া খুব কম শিশুই পারে, অরুন্ধতীর মত এই সিদ্ধান্ত নিতে।

ব্যক্তিগত একটা সাক্ষাৎকারে লেখিকা খুব কষ্টের সাথে বলেছেন আমি আমার মা কে “unmother”বা “অমাত্রিয়িত” শুধু করিনি, বরং

তার সাথে নিজেকে undaughter বা অকন্যায়িত করেছেন। মেরী (অরুন্ধতীর মা) একদমই প্রস্তুত ছিলেন না বিয়ে করার জন্য, মা হওয়া তো সেখানে দূর অস্ত।

নিজের মদ্যপ পিতার হাঁত থেকে বাঁচতে একরকম বাধ্য হয়ে ঠিক করেছিলেন যে পুরুষ তাকে প্রথম বিয়ের প্রস্তাব দেবে তাকেই তিনি বিয়ে করে নেবেন, এবং

সেই মতো এক পুরুষকে বিয়ে করেন মেরি। কিন্তু তার ভাগ্য তাকে সেখানেও সুখ দেয়নি। বিয়ের পর দেখলেন তার স্বামী ও আপাদমস্তক মাতাল। একজন বেকার লোক।

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েই মেরির পেটে আসে অরুন্ধতী ও তার ভাই। লেখিকার কথায় ভালো মা হয়ে ওঠার জন্য যা যা করা দরকার তিনি তা না করতে পারলেও,

দুজন সন্তানের উপর তিনি যে নির্মমতা দেখিয়েছেন তা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

মেরী রায়ের বিরাট ক্রোধ ছিল পুরুষ জাতির প্রতি। আর এটা হওয়া বেশ স্বাভাবিক বলেই আমার মনে হয় কারণ নিজের স্বামী, বাবা, ভাই এর কাছ থেকে ভালোবাসা,

তো দূরে থাক সামান্য সাহায্য সহানুভূতি এসব কিছুই পাননি যেগুলো একটা মেয়ে আশা করে। তাই অরুন্ধতীর সাথে তার,

ভাইকেও যাবতীয় নির্মমতা ও অবদমনের স্বীকার হতে হয়েছে। অরুন্ধতী রয় এখানে বেশ মজা করে লিখেছেন

ভারতবর্ষের মতো দেশে যেখানে অধিকাংশ মায়েরা পুত্র সন্তান চায় সেখানে একটি মাত্র পুত্র সন্তানকে হাতের কাছে পেয়ে, তিনি

যাবতীয় শোধ তুলতে পেরেছিলেন। এছাড়াও মেরি রয় পুলিশ ও উকিলের সাহায্য নিয়ে যেভাবে নিজের মাকেও ভাইকে বাড়িছাড়া করিয়েছিলেন,

আর স্কুল বানাবেন বলে কৃষক জমি বিক্রি করতে না চাওয়া তে তাকে নিজের জমি থেকে উৎখাত ফুরিয়েছিলেন তাতে আমার মেরীকে  ঠান্ডা মাথার এক ধনতন্ত্রি মহিলা বলেই মনে হয়।

এমনকি অরুন্ধতী যখন হোস্টেলে তখন তার মা মেরি অরুন্ধতী প্রিয় কুকুরকে মেরে ফেলেছিল সে পেডিগ্রী ছাড়া

অন্য কুকুরের সাথে মিলিত হয়েছিল বলে। এর থেকে বোঝা যায় মেরী রায় সাংঘাতিকভাবে মানসিক বিকৃতির শিকার ছিল ।

কিন্তু বাড়িতে দুজন ছোট ছোট ছেলে হয়ে থাকায় তার মায়ের মানুষের চিকিৎসা করার কেউ ছিল না।

মেরী রয় এর ভালো দিক?

নিজের মেয়েকে শেক্স পিয়ারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মেরী রয়। কিপলিং এর সঙ্গে পল রোবসন গাইতেন।

প্রতি তিন মাসে মাদ্রাজের একটা লাইব্রেরী থেকে বই এর পার্সেল আসতো। সে এক তুমুল উত্তেজনা ছিল বালিকা অরুন্ধতীর জন্য। কমিউনিজিম মেয়ে বিশ্বাস করতেন অরুন্ধতীর মা।

মেয়েকে তিনি ভিয়েতকং কন্যার পোশাকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন, যেটা অরুন্ধতী পড়তেন নীলগিরির সেই মিলিটারি হোস্টেলে এসে।

A black and white photograph of a 1990 viewer, showing writer Arundhati Roy in the same frame with her mother and brother. All three of them are sitting.
ভালোবাসা
নিজের ছেলে মেয়ের সাথে মেরি রয় (image source: google images)

মেরী রয় একটা স্কুল তৈরি করেছিলেন যেটা ছিল কোট্টায়ামে শ্রেষ্ঠ এক শিক্ষায়তন। মেরি লরি অগতানুগতিক স্থাপত্যে নিদর্শন তৈরি করেছিলেন বাড়িতে

তিনি সিরিয়ান ও খ্রিস্টান নারীদের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সুপ্রিম কোর্টে কেস করে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পেয়েছেন।

অরুন্ধতীর প্রথম উপন্যাস ও তার পরবর্তী জীবন?

অরুন্ধতীর প্রথম উপন্যাস”God of small things”তাকে এনে দেয় বিপুল অর্থ, খ্যাতি ও “বুকার পুরস্কার”।

বুকার পুরষ্কার পাওয়ার পর  লেখিকা “নর্মদা বাঁচাও” আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন, এবং লেখেন “the greater commmon good” প্রবন্ধ।

এরপরে কাশ্মীর এর ঘটনাবলী নিয়ে লেখা ও মাওবাদীদের সঙ্গে তার অভিযাত্রা এই সব থেকেই আমরা অরুন্ধতী রায়কে

স্পষ্টবাদী ,তেজস্বিনীও প্রতিবাদী লেখিকা হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।

অরুন্ধতী রায় বলেছেন মাকে ভালবাসতাম না বলে ছেড়ে যায়নি বরং ,

যাতে ভালবেসে যেতে পারি আর সেই ভালোবাসা যাতে গভীর হয় সেই জন্যই মাকে ছেড়ে দূরে চলে গেছিলাম।

মা মেরির প্রতি অরুন্ধতীর কর্তব্য?

ছোট্ট অরুন্ধতী মাত্র তিন বছর বয়সে দেখেছিল মায়ের হাঁপানি এমন মারাত্মক জায়গায় পৌঁছে যায় যে মা কে বাঁচানো মুশকিল হয়ে যায়।

ছোট্ট অরুন্ধুতি সেদিন খুবই ভয় পেয়েছিল আর তার এই ভয় ছিল ৮৯ বছর বয়স পর্যন্ত যতদিন তার মা মেরি বেঁচে ছিল

সেই সময় অরুন্ধতীর মা তার এই অসুস্থতার জন্য তার সন্তানদেরই দায়ী করত। মায়ের থেকে দূরে থেকেও

নিজের অনেক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও অরুন্ধতী কেরল ছুটে এসেছেন মাকে স্কুলের কাজে সাহায্য করতে। মায়ের কাছ থেকে অনেকবার অপমানিত হয়েও

অরুন্ধতী সব সময় মাকে ছোট বাচ্চা সরল মেয়েদের মতোই ভালোবেসে এসেছেন। তাই এই বইটি পড়লে তোমার মনে ,

হতে পারে এই বইটা কি “মায়ের প্রতি নিজের অসহায় ভালোবাসা পালন করা” নাকি অরুন্ধতীর জীবনের সবথেকে বড় গ্যাংস্টার হয়ে যিনি ছিলেন

তার শোককে অমরত্ব দেওয়া”

এই বই নিয়ে আমার মতামত?

আমি বলব হয়তো অরুন্ধতী এই বইটা লিখেছে শিকড় থেকে উৎখৃপ্ত হয়ে তার ছিন্ন ভিন্ন জীবনের হাহাকার, কে

একটা কাহিনীতে রূপ দিয়ে সেই যন্ত্রণা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে। তাই তিনি এই বইটা লিখেছেন মায়ের মৃত্যুর পর কারণ,

মা বেঁচে থাকলে এই বই লিখে প্রকাশ করা তার কাছে একটু কঠিনই হতো। তাই এখানেও আমরা অরুন্ধতীর মায়ের,

প্রতি গভীর ভালবাসা টাকেই দেখতে পাই, যেটা অরুন্ধতীর মধ্যে ছোটো বেলা থেকেই ছিল এরপর

অন্যদিকে আফজল গুরুর ফাঁসি, কাশ্মীর ইস্যু, মত বিষয়ে ভাষণ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন এবং

অন্যদিকে  নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে সমাজকর্মীর ভূমিকা পালন করেছেন ঠিক তেমনি

পরবর্তী সময়ে অনেকে আদালত অবমাননা এর দায়ে জেলও খাটতে হয়।বই পড়লেই বোঝা যায় চিরকাল নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছেন ,

ব্যক্তিগত জীবনে লেখিকা ,পরিচালক প্রদীপের সঙ্গে সুখের দাম্পত্য জীবন থেকেও একটা সময় বেরিয়ে আসেন লেখিকা,

হয়তো ছোটবেলায় ভালোবাসা আর শৈশবের খারাপ স্মৃতি থেকেই সুখ আর স্থায়িত্বের সঙ্গে চিরকাল বিরোধ লেখিকার।

যাতে স্বামী হোক বা সমাজ কেউই তার বাক স্বাধীনতাতে সামান্য টুকু হস্তক্ষেপ করতে না পারে। আর সেই জন্যই হয়তো আমরা পেয়েছি এরকম অসাধারণ একজন প্রতিভাবান লেখিকাকে।

In this black and white photo, we see an 80-year-old woman sitting on a chair with a rather bored look on her face. It is clear from the look that the old woman is very sad.
ভালোবাসা
মেরি রয়ের একদম শেষ বয়সের ছবি (image source: google images)

লেখিকা কোন দিন নিজের বাঁক স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হতে দেননি হয়তো এই কারণেই হয়ত সারাটা জীবন তিনি নিজের শর্তে বেঁচেছেন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *