2047 সাল অর্থাৎ ভারতবর্ষ দেশের স্বাধীনতার ঠিক 100 বছর। শুনলেই তো কি রকম আমার গায়ে কাটা দেয়। আমি যখন
এই ব্লগ টা লিখছি তখন 2026 সালের ফেব্রুয়ারি মাস। তার মানে ঠিক একুশ বছর পর আমরা কোথায় পৌঁছাবো। কিন্তু
একটা কথা মনে রাখবে মানুষ হোক বা দেশ তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি কিন্তু ভবিষ্যত্ নির্ধারন করে।
বর্তমান বিশ্বে ভারতবর্ষ কে পৃথিবীর চতুর্থ অর্থনীতির দেশ বলা হয়, কিন্তু আমরা পড়ি উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আমরা পৃথিবীর প্রথম ১০০টা দেশের মধ্যেও আসিনা, ১০০ টা তো বাড়িয়ে বললাম প্রথম দেড়শটা দেশের মধ্যেও আসিনা।
কিন্তু বায়ু দূষণ, বেকারত্ব, আর দারিদ্রতা, অপুষ্টি এই সবকিছুতেই আমরা ক্রমশ এগিয়ে চলেছি। আর সেই সাথে বেড়েছে আমাদের দেশের মধ্যের দুর্নীতি এবং
আছে ধর্ম নিয়ে ভেদাভেদ, দাঙ্গা আর তার সাথে রাজনৈতিক নেতাদের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি। এবার আসা যাক এই বই এর বিষয় বস্তুতে
https://www.crossword.in/products/will-india-get-rich-before-it-turns-100-a-reality-check
এই বইতে আসলেই কি আছে?
ভারতবর্ষ এর অর্থনীতি নিয়ে লেখা বই গুলো যদি তুমি পড়ে থাকো তাহলে দেখবে সেই বইগুলো। হতাশা আর বুক চাপড়ানো তে ভর্তি, অর্থাৎ
বইগুলো নেগেটিভ খবর আর দিকগুলোকেই বেশি করে তুলে ধরেছে ।
২০৪৭ সালের মধ্যে আমরা পৃথিবীর প্রথম বিশ্বের দেশের মধ্যে আসতে পারবো কিনা তার জন্য আমাদের কি কি অবকাঠামো দরকার, এবং
শিক্ষা স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও রপ্তানি কোন দিকগুলোতে আমাদের সব থেকে বেশি নজর দেওয়া উচিত , উৎপাদনের পাশাপাশি আমাদের পরিষেবার দিকেও কি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত
এই সমস্ত কথা খুব সুন্দর শব্দ চয়নের মাধ্যমে এই বইতে তুলে ধরা হয়েছে এবং এতটাই সুন্দর করে বোঝানো হয়েছে যা পাঠকদের বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না।
প্রসেনজিৎ দত্ত এর লেখা এই বই নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করে আমাদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ভালো-মন্দ দিকগুলো খুব সুন্দর করে বিবেচনা করে।
এবং এটাও লিখেছেন যে তিনি আশা করেন আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ বা নীতি নির্ধারকরা আমাদের এই জেনারেশনের জীবদ্দশাতেই
একটা উন্নত অর্থনীতির দিকে ভারতবর্ষকে নিয়ে যাবেন।
ভারতবর্ষ এর উন্নয়ন বলতে আমরা কি বুঝি?
আমরা তো কথায় কথায় বলেই থাকি আমরা পৃথিবীর 4th largest ইকোনমি ।
কিন্তু এখানে মিস্টার দত্ত প্রশ্ন করেছেন বিশ্ব ব্যাপীর জিডিপি লীগ টেবিলে ভারতের এই অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ? তুমি আরো বলেন মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি নাকি সামগ্রিক উন্নয়ন,
কোনটা আমাদের মত দরিদ্র দেশের জন্য সব থেকে বেশি কোনটা জরুরী। মনে রাখতে হবে আমরা 4th লার্জেস্ট ইকোনমিক দেশ হল এখনো একটা দরিদ্র দেশের মধ্যে পরি।
প্রসেনজিৎ দত্ত এই বইতে পাঠকদের বিভিন্ন উন্নত দেশের মর্যাদা বোঝাতে থ্রেশহোল্ড এর তালিকা, তৈরি করে দেখিয়েছেন।
প্রসেনজিতের কথাই ভালো নীতি নিতে গেলে ভালো তথ্যেরও দরকার হয়। যেমন লেখক বলেছেন ভারত এখনো তার আদমশুমারি অনুশীলন করেনি তাই,
সরকারের কাছে জনসংখ্যার বয়স, জনসংখ্যার তারাতম্য, মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা, জনসংখ্যার দশকের তারতম, তপশিলি জাতি ,বর্ণ, এত কিছু সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য নেই।
দত্ত দৃঢ় ভাবে বলেন উন্নত দেশ আর উন্নয়ন দেশ সম্পূর্ণ ভাবে আলাদা। মার্কিন বিচারপতি পটার স্টুয়ার্ট এর সেই বিখ্যাত উক্তি যখন তাকে পর্ণগ্রাফি সমন্ধে জিজ্ঞেস করা হয় উনি বলেন”আমি যখন এটি দেখি তখনই তা বুজতে পারি”।
বিখ্যাত বাস্কেটবল প্লেয়ার যোগী বেররা বলেছেন “ভবিষ্যতে কি হবে আমরা তো আগে থেকে কেউ বলতে পারি না”এবং
এই লাইনের উপর ভিত্তি করেই প্রসেনজিৎ দত্ত আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অস্থায়ী প্রকৃতির উপর জোর দিয়েছেন”কিন্তু
এরপরে তিনি নজর দিয়েছেন পূর্ব এশিয়ার বড় বড় দেশগুলো যেমন চিন ,জাপান ,কোরিয়া, দ্রুত উন্নতশীল দেশগুলোর ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে
ভারতবর্ষের এই বিপুল জনসংখ্যা যে একটা বড় সুবিধা এবং এই জনসংখ্যর পণ্য পরিষেবার জন্য বিরাট বাজারের আকর্ষণ দেখে তিনি বলেন,
” ভবিষ্যতে ভারতের অর্থনীতি ৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি না পেলেও ২ দশক বা তার বেশি সময় ধরে ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে”
ভারতবর্ষ যে সমস্যা গুলো সম্মুখীন হবে?
প্রসেনজিৎ দত্ত এর কথায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর জলবায়ু পরিবর্তন প্রধান দুটো বিপর্যয় ভরতের জন্য।
এই সময়ে দাড়িয়ে পৃথিবীর দূষিত শহরগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই ভারতে অবস্থিত। তাই বিশ্ব উষ্ণায়ন ভারতবর্ষের জন্য বিরাট বড় একটা চ্যালেঞ্জ।
এর দ্বারা ভারতবর্ষের অনেক অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হবে , অনেক জায়গায় বন্যা দেখা দেবে। এবং
তিনি আরো বলেন যে AI যে ভাবে এগোচ্ছে তাতে AI খুব শিগগিরই অনেক শিল্পকে অটোমেশনে রূপান্তরিত করবে এবং
এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভারতবর্ষ এর মত দেশে অনেক মানুষের চাকরি প্রশ্নচিহ্নের মুখে এসে দাঁড়াবে।
এমনকি যার প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যেই পেয়েছি ভারতবর্ষের অনেক আইটি কোম্পানি একরকম বাধ্য হয়ে ছাটায়ের দিকে হেঁটেছে।
রোবটিক্স থেকে শুরু করে জেনারেতিভ AI, ও অন্যান্য মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম এর কারণে আমাদের চারিদিকের পরিস্থিতি কিভাবে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং
প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসাবে সস্তা শ্রমের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন আর সেই দিন নেই যেখানে চীন
বিশ্বায়ন আর মুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে বিশ্বের কর্মশালায় পরিণত হবে। প্রসেনজিৎ দত্তের কথায় ভারতবর্ষ এর ভূ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় দাঁড়িয়ে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের দেশীয় উৎপাদনের উপর বেশি জোর দেওয়া উচিত।
লেখকের শেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন?
লেখক এর কথায় আমাদের ভবিষ্যৎ যখন এতটাই অনিশ্চয়তা এবং বিপদের মুখে তাহলে স্বাধীনতার ১০০ বছর যখন পূর্ণ হবে,
তখন উন্নত জাতি, ও উন্নত দেশ হিসেবে কিভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করব সেই প্রশ্ন এখন থেকেই আমাদের করা উচিত।
“দ্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড : আ নিউ পার্সপেক্টিভ ওন দ্য ইকোনমিক কনসিকভেন্স অফ পপুলেশন চেঞ্জ ” ২০০৩ সালে প্রকাশিত এই গবেষণা পত্রে যেটা তৈরি করেছিলেন
ডেভিড এ ব্লুম, ও ডেভিড ক্যানিং, ও জেপি সেভিলা কতৃক উপস্থাপিত হয়। এখানে প্রধান চারটি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে,
১. জনস্বাস্থ্য ২. পরিবার পরিকল্পনা 3. শিক্ষা ৪. শ্রমবাজারের নমনীয়তা
লেখক নাম করে উল্লেখ করে বলেছেন সেই দুটো সরকারে সব থেকে বড় ব্যর্থতা হল জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগের অভাব।
লেখক চীনের উদাহরণ টেনে বলেছেন যে শি জিঙপিং এর লক্ষ্য হলো ২০৪৯ সালের মধ্যে চীনকে একটি সম্পূর্ণ উন্নত বিশ্বের দেশে পরিণত করা, কিন্তু
অদ্ভুতভাবে আমাদের দেশের কোন প্রধানমন্ত্রী মুখে এরকম কিছু শোনা যায়নি। ভারতের পক্ষে এই কাজ করা মোটেই সহজ হবে না অন্তত এই ভোটের রাজনীতির কারনে।
তাই আমাদের দেশে নীতি নির্ধারকদের এই বই থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত, এবংবিশ্ব অর্থনীতির অশান্ত নদীতে যেভাবে ভারতের অর্থনীতি দুলছে সেই দিকে ফোকাস করা উচিত।
