একাকীত্ব বা যাকে আমরা lonelyness বলি শব্দ টা বর্তমানে favebook whatsapp এর যুগেও কতটা প্রাসঙ্গিক তাই না।
আমাদের প্রত্যেক আর হাতেই স্মার্টফোন, তাতে আবার আনলিমিটেড কল তাও যেনো আমরা ফোন করতে দ্বিধা
বোধ করি, সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই প্রিয় অপ্রিয় মানুষ এর ছবি তার পরেও যেনো একাকীত্ব বা lonelyness
আমাদের সঙ্গী। এই একাকিত্ব(loneliness) এর উপর ভিত্তি করেই কিরণ লিখেছেন তার নতুন উপন্যাস “the loneliness of Sonia and sunny”
এই বই এর উপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলে মনে হবে যেন এটা আর সাধারণ পাঁচটা বই এর মতই রোমান্টিক কোনো বই কিন্তু
এই বই পড়লে বুঝবে এই বই এর বিষয়বস্তু যথেষ্ঠ সমৃদ্ধি ও জটিল প্রকৃতির। এই বই যতো পড়বে তত তোমার সামনে ভেসে উঠবে,
সম্পর্কে টানাপড়েন এ আবদ্ধ পরিবারগুলোর এক অন্তরঙ্গ চিত্র । যেখানে দেখতে পাবে অতীতের মানসিক আঘাত ও
সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার মাঝে নিজেদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দুই প্রেমিকের গল্প। জানতে পারবে কি ভাবে লেখিকা
ক্ষমতার গতি প্রকৃতি নিয়ে এক গভীর ভাবনা তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে এবং
উত্তর ঔপনিবেশিক বিশ্বে অভিবাসন ও জাতি ও লিঙ্গের পরিচয়ে এক সুক্ষ অনুসন্ধান করেছেন।
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি বিরতির পর কিরণ দেশাই যেন বিজয়ীর মতো এই উপন্যাস নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছেন।
কিরান দেশাই কে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক ও রসবতসম্পন্ন লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল লেখা শেষ উপন্যাস “the inheritance of lose”।
যেটা ২০০৬ সালে বুকার পুরস্কার জিতেছিল। যদিও এই বইটাও”the loneliness of Sonia and sunny” বুকার পুরস্কারে মনোনীত হয়েছিল।
একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা যখন এই বইয়ের বিষয়ে হয়ে ওঠে?
এই উপন্যাসের প্রকৃত বিষয়বস্তু হলো নিঃসঙ্গতা। আর আমরা যারা কিরণ দেশাই বই পড়েছি তারা জানি নিঃসঙ্গতা লেখিকার কাছে,
শুধু আবেগগত নয় এটা রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক। দেশাই এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ১৯৯০ থেকে ২০১০কের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে লিখলেও
এই উপন্যাসকে আশ্চর্যজনকভাবে সমসাময়িক বলা যায়। এই উপন্যাস অভিবাসী জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত,
যা আত্মবিলপ ও আত্মঘৃণা রূপে প্রকাশ পায়। এইজন্যই আমরা বলতে পারি এই প্রাতিষ্ঠানিক একাকীত্ব এই বইতে থাকা চরিত্রগুলোর জীবন ধারনে প্রকাশ পায়।
ভারমেন্ট শহরের একটি কলেজের ছাত্রী সোনিয়া তার থেকে বয়সে বড় , ম্যানুপুলেটিভ পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
আর অন্যদিকে উজ্জল শ্যাম বর্ণ গায়ের রং এর সানিব্রুকলিন তার নতুন আমেরিকান
প্রেমিকা এর সাথে প্রেম করতে ব্যস্ত। দুজনের পছন্দ ই একরকম এর আর দুজনেই অন্তরঙ্গতার মাধ্যমে,
আপনজন কে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু যে সম্পর্ক মলমের মত কাজ করার কথা ছিল তাই ক্ষতে পরিণত হয় সোনিয়া আর সানি ব্রুকলিন এর জীবনে।
https://www.britannica.com/biography/Kiran-Desai
তাঁদের সম্পর্ক তাদের নিজেদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। এখানে কিরণ দেশাই যুক্তি ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক তিনি বলেন,
“একাকীত্ব কখনোই শুধুমাত্র প্রেম আর সান্নিধ্য দিয়ে নিরাময় হয়না, বরং গ্রহণযোগ্যতার সন্ধানে গিয়ে যখন নিজেকে
বিক্রিত করতে বাধ্য করা হয় তখন তা আরো গভীর হয় “। ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে একাকীত্ব ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
আমরা যে পরিবার ও সমাজকে সহায়ক বা সাহায্যকারী বলে মনে করি তারা এমন এক টানাপোড়নের সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে যে
সেটা বিচ্ছিন্নতাবাদকে আরো গভীর করে তোলে। গল্পে দেখা যায় সানিব্রুকলিন এর বিধবা মা ববিতা সানির কাকাদের সাথে
একই বাড়িতে বসবাস করে, এবং কাকাদের সাথে সানির মায়ের সব সময় একটা ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকে। প্রত্যাশার চাপে
সানির মায়ের মধ্যে নিঃসঙ্গতা তৈরি হলেও শারীরিকভাবে তিনি একা নন, এবং
তার চিন্তায় আছে তার ছেলের সাফল্য ও তার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে।
কিরন দেশাই এর মনোযোগ এই উপন্যাসের অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি প্রতিটি চরিত্রকে তাদের মতো করে একটা বিচ্ছিন্নতার ছাপ দেন এবং
এই উপন্যাসটাকে কেন্দ্রীয় জুটির গন্ডির বাইরে নিয়ে গিয়ে নিজের দৃষ্টিকোণ দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলেন।
সানিব্রুকলিন এর সেই আমেরিকান বন্ধু একজন ভালো স্ত্রী খুঁজছে যে তার সাথে আমেরিকায় গিয়ে থাকবে,
আমেরিকান বন্ধুর এই কাজ এই সাংস্কৃতিক প্রত্যাশাকেই প্রতিফলিত করে যে বিয়ে একাকীত্ব দূর করতে পারে, এবং
একটা মানুষের সঙ্গে আরেকটা মানুষের সঙ্গই জীবনে প্রতিকূলতার প্রতিকার। এবং অন্যদিকে আমরা
দেখতে পাই যে সোনিয়ার মায়ের অবিবাহিত মুসলিম বান্ধবী ফারিজা প্রাতিষ্ঠানিক একাকীত্বের শিকার এবং ভারতের একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের
অবিবাহিত নারী হওয়ার জন্য তাকে সবসময় নিজের রাগ ও আকাঙ্ক্ষা দমন করে অনেক বাধ্য বাধকতা ও কৃতজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে চলতে হয়।
তাই কিরণ দেশাই এর উপন্যাস আমাদের চোখ দিয়ে দেখিয়ে দেয় একাকীত্ব বা loneliness খুব কমই মানসিক সমস্যা ,
বরং এটা সমাজের মধ্যেই গেড়ে বসে থাকা একটা সামাজিক সমস্যা।
এই উপন্যাস আমাদের কি শিখিয়ে যায়?
কিরন দেশাই এর সহানুভূতি প্রকাশ এর ক্ষমতা এই উপন্যাস কে যেনো আরো উপরে নিয়ে গেছে। বই পড়ার সময় বুঝবে,
বই এর চরিত্র গুলো স্বার্থপর, দূরত্ব বজায় রাখা স্বভাবের হলেও বহুমাত্রিক, আত্ম আবিষ্কার এর আবহে যথেষ্ট জীবন্ত।
তাদের সংশোধন করা যে অসম্ভব তা কিন্তু নয়। অন্যান্য উপন্যাসে যেখানে পাঠকদের মোহমুক্ত করে
পারিবারিক কাহিনী গুলো প্রায়শই ক্ষয়কারী হয়ে ওঠে সেখানে কিন্তু
এই উপন্যাসে কিরন দেশাই ঠিক উল্টোটাই করেছেন, তিনি ত্রুটির মধ্যে দিয়ে প্রতিটি চরিত্র কে এবং সামগ্রিকভাবে
পরিবারের কাছে আমাদের টেনে আনেন। উপন্যাস এর কোনো চরিত্র গৌণ নয়, এমনকী বাড়ির কর্মচারী, চালক, রাঁধুনি,
এমনকি দূরবর্তী বন্ধুদেরও বাস্তব মনে হওয়ার মতো যথেষ্ঠ সূক্ষ্মতা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকেই ঘুরে ফিরে এই উপন্যাস
এর মধ্যে এসেছে। দেশাই এর এই চরিত্র গুলো এতটাই জীবন্ত যে মনে হবে যেন আমরা এই চরিত্রগুলোর মধ্যে বাস করি।
আর কিরন দে চাই এই সমস্ত চরিত্রের মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন যে এই খন্ডিত পৃথিবীতে মানুষ হয়ে জন্মানোর অর্থ কি?
এই বই নিয়ে আমার মতামত?
সোনিয়া ও সানি এই দুজনের পরিবারকে পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে পাঠকরা নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতে পারে।
তাদের নিজেদের উদ্বেগ ,স্বীকৃতির জন্য তাদের আকুতি, ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যেকার দৈনন্দিন বোঝাপড়া, ও তাদের নিজেদের একাকীত্ব যা
প্রতিটি জীবনকে গড়ে তোলে। এর মাধ্যমেই সোনিয়া আর সানিকে কেন্দ্র করে লেখা কিরান দেশাইয়ের এই উপন্যাস,
আর পাঁচটা প্রেমের উপন্যাস থেকে এই উপন্যাসকে আলাদা করে তাই আমরা সোনিয়া আর সানির রোমান্সে ভেসে না গিয়ে
তাদের ব্যক্তিগত সুখ ও আত্ম উপলব্ধির জন্য প্রার্থনা করি। উপন্যাস এই প্রবাদ বাক্য কে প্রমাণ করে যে”আমরা পৃথিবীতে একাই আসি আর একাই চলে যাই”।
এই উপন্যাস কোন নৈরাশ্যবাদ ছাড়াই আত্ম উপলব্ধি ও সহনশীলতার সেই ছোট ছোট কাজগুলোকে উদযাপন করে,
যা জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।