Rahul Bhattacharya’s Railsong আমাদের সামনে তুলে ধরে রেলপথের ইতিহাস ও একটি পরিবারের উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে বর্তমান ভারতের গল্প”
কিরান দেশাই এর একটা চিত্তাকর্ষক উপন্যাস, ও অরুণ দেশাই এর মর্মস্পর্শী স্মৃতিকথা শেষ করার পর আমার হাতে আসে।
দীর্ঘ ১৪ বছর পর উনি একদম নতুন একটা কল্পকাহিনী নিয়ে ফিরে এসেছেন যার নাম দিয়েছেন “রেল সং”।
আমরা রাহুল ভট্টাচার্য কে চিনি ২০০০ এর দশকে শুরুতে ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে। তার প্রথম বই ছিল “pandith from Pakistan” যেটা,
২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। এই বই এর বিষয় বস্তু ছিল ২০০৩-০৪ সালে প্রতিবেশী দেশে ভারতীর ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক বিবরণ।
রাহুল তার উষ্ণ ,কোমল , তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, এবং সেই সাথে নিজস্ব স্বতন্ত্র বাচন ভঙ্গি, তাকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
https://thebookscope.com/?p=1408
এরপরে ২০১১ সালে আসে “the sly company of people who care” ভ্রমণ কাহিনী ও উপন্যাস এর সংমিশ্রণ, যেখানে মানুষ ও তাদের সব,
অদ্ভূত স্বভাব গুলো তুলে ধরার মধ্য দিয়েই তিনি তার তীক্ষ্ণ শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তির পরিচয় দিয়েছেন।
ধুর্ত ও প্রলোভনে ভরা দেশ Guyana কে নিয়ে তিনি এমন এক কাহিনী লিখেছিলেন যার জন্য তার এই উপন্যাস ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
http://Railsong by Rahul Bhattacharya | Goodreads https://www.goodreads.com/en/book/show/231690109-railsong
গল্পটি একদিকে যেমন ছিল তীক্ষ্ণ, লাগামহীন, মজাদার। সত্যি কথা বলতে এটা একটা দুঃসাহসিক কাজ যেটা রাহুল ভট্টাচার্য এর তরুণ
সাহসি লেখক দের দ্বারাই সম্ভব।
রেলসং বই হিসেবে কেমন?
রাহুল ভট্টাচার্য নিজস্ব শৈলীর ছাপ রেখেই এই বই কে বেশ পরিণত ভাবে লিখেছেন। এই বইতে যেমন হাস্যরস এর অবিরাম স্রোত আছে, ঠিক
সমান ভাবে আছে গাম্ভীর্য আর গভীরতা। তাই এই কাহিনী থেকে আনন্দ আর বিনোদন দুটোই পাঠক রা সমান ভাবে পায়।
The Menon Investigation Book Review||এক নতুন রহস্যের খোঁজে
তবে এটি ” স্লাই” কোম্পানি এর মত শ্লেষ আর অভ্যন্তরীণ রসিকতার জগৎ নয়। তাই এই কাহিনী এর সাথে খাপ খাওয়াতে,
দর্শক দের একটু সময় লাগতে পারে। তাই এই গল্পের ছন্দ খুঁজে পাওয়ার আগে প্রথম দিকের পৃষ্ঠা গুলোতে কিছুটাশব্দ বহুল মনে,
হতে পারে, একদম শেষ পর্যায় তোমাকে মন্ত্র মুগ্ধ করবে। এই বই এর কাহিনির মূলত বছরের ভার, ও সম্পর্কের অনিশ্চয়তা,
সভ্যতার অগ্রগতি, এবং মানবতার পশ্চাদ অপসারণের গল্প। গল্পে জুড়ে থাকা ব্যক্তিগত, ও জাতীয় বিয়োগান্তক ঘটনা গুলোর আবহ,
সঙ্গীতের মত বেজে চলে, নাম – গানটি যা তৈরি হয়েছে বিষন্ন ও উজ্জ্বল সুরের সমন্বয়ে। একদম ব্যতিক্রম একটা
পরিবার কে কেন্দ্র বিন্দুতে রেখে এই উপন্যাস লেখা হয়েছে। ভারতীর রেলের একজন কর্মচারী অনিমেশ কুমার চট্টোপাধ্যায়,
সে বর্ণ জাতিভেদ প্রথার বাইরে বেরিয়ে, সমাজ কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ব্রাহ্মণ জাতির উপাধি ত্যাগ করে,
এক বিহারী নারীকে বিয়ে করেন। তার স্ত্রী তাকে ভালোবেসে মিস্টার চিতল বলে ডাকতেন। তার স্বামী এই উপাধি টা গ্রহন করে, তাদের সন্তান দের জন্য।
পরে তাদের সন্তানেরা বড় হওয়ার সাথে সাথে জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে ক্রমশ বিভক্ত হতে থাকা নিজের বাবার সিদ্ধান্তের
পরিণতি নিয়ে বাঁচতে থাকে। অনিমেষের এই সিদ্ধান্ত মানবতা বাদী মূল্যবোধের পাশাপশি ভালোবাসা দ্বারাও অনুপ্রাণিত আর সেই কারণেই,
সে তার রেলওয়ে ফরম্যান এর কাজের প্রতি ভালবাসা। গল্পে সে তার সহকর্মী চারু কে বলে “ভারতীয় রেল ধর্ম, ভাষা, রাজ্যের সীমানা, শীত গ্রীষ্ম বর্ষা দেখেনা,
“আমাদের রেল কর্মী দের প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়, কারন ভারতীয় রেল ছাড়া এই দেশ ভারত থাকবে না”
অনিমেষ এর এই মহৎ ভাবাবেগের মধ্যে যদি সত্যতা থাকলেও এর মধ্যে কিছুটা নুন ও আছে। ভারতীয় রেল যেমন এই দেশকে,
ঐক্যবদ্ধ করে, তেমন এই ভারতীয় রেল দুর্নীতি বিভাজনের মাইন ক্ষেত্রও বটে, আবার অন্য দিকে
পৃথিবীর দুর্দশাগ্রস্ত দের কর্ম সংস্থান জোগায়।১৯৭৪ সালে শ্রমিক ধর্মঘট এর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন যে ভারতীয় রেল,
তিন সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয়ে গেছিল, আর সরকার মাথা নত করেছিল। এই সময় অনিমেষ উন্নত বেতন, কাজের পরিবেশ এর জন্য,
দাবি করলে, তাকে উল্টে “দেশদ্রোহী” তকমা দিয়ে তাকে তার বাসস্থান ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা হয়। নিজের জায়গা থেকে উৎখাত হয়ে
তারা এমন একটা নিকটবর্তী গ্রামে আশ্রয় নেয় যেখানে সুযোগ-সুবিধার প্রতিষ্ঠিত গতি প্রকৃতি আগে থেকেই নির্ধারিত হয়।
এখানে খুব স্বল্প সময় থাকলেও চারুর আবেগিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এই জায়গা গঠনমূলক মুহূর্ত হয়ে ওঠে এবং এরপর এসে এখান থেকে মুম্বাই চলে যায় ।
এখানে এসে স্বাধীনতার আজীবন স্বাদ লাভ করলেও , যেটা তার ব্যক্তিগত জীবনে হুমকি স্বরূপ । এই উপন্যাস এই মহান শহরের প্রতিও ,
একটা স্তব জ্ঞান, যা শারীরিক ও আধ্যাত্বিক ভাবে গৃহহীন দের মিলন স্থল। এক পরিবারে ভাগ্য পরিবর্তনে মধ্যে দিয়ে রাহুল ভট্টাচার্য,
আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসকে তুলে ধরার মাধ্যমে গল্প বলার একটা নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছেন।
নিজের গভীর, নিখুঁত গবেষণা কে এমনও এক আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন যে আমলা তান্ত্রিক এর মত সাধারণ তুচ্ছ বিষয় কেও
আকর্ষণীয় কাহিনী মনে হচ্ছে। নিখোঁজ ও মৃত শ্রমিক, মানবিক কারণে চাকরিপ্রার্থীর পরিবার, এবং রেলওয়ের অন্যান্য সন্দেহজনক সুবিধা ভোগী,
তদন্ত করতে চারুর ভারত জুড়ে ভ্রমণ, তার এবং তার বইয়ের পাঠকদের জন্য যেন এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
লেখক রাহুল তার জটিল কাহিনীর মধ্যে দিয়ে এমন এক সত্যের স্তর গুনে দেন যা ঐতিহাসিকরা কোনদিনই পুরোপুরি,
উদ্ধার করতে পারেনি। এই সত্যগুলো উঠে আসে সেইসব মানুষদের থেকে যাদেরকে আমরা জানি ঝাড়ুদার লাইক ম্যান ও স্টেশন মাস্টার ,
হিসেবে যারা মাসের পর মাস বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় রেলকে সচল রেখে গেছে। আর যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য
কাজ করে গেছে। রাহুল ভট্টাচার্য কথা সাহিত্যিক হিসেবে কতটা পরিণত তা তার সৃষ্ট চরিত্র “মিস চিতল” কে দেখলে বোঝা যায়।
এই চরিত্র একজন পুরুষ লেখকের লেখা সব চেয়ে বিশ্বাস যোগ্য, বাস্তবধর্মী, নারী চরিত্র হিসেবে আমি মনে রাখবো।
এই বই এর মাত্র একটি অধ্যায় বাদ দিলে বাকি সব অধ্যায়ে রাহুল ভট্টাচার্য তার অভিজ্ঞতা স্পন্দন একান্ত নারীদের বিজয় ও আতঙ্কের মুহূর্ত
সহানুভূতির সাথে সাবলীল ভাবে তুলে ধরেছেন।
ব্যক্তিগত সংগ্রামের পাশাপাশি “রেল সং” সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান পতনের গুঞ্জন কে বাঁচিয়ে রাখে, ।
গানটি কেবল স্মৃতিচারণ ও বিষাদের স্তবজ্ঞান নয়, এটি সাম্প্রদায়িকবিদ্বেষের বেসুর ও সুর এবং সাধারন ইসলাম ও ফোবিয়ার ,
ফুলিঙ্গের একটা শ্বারক। যেটা ১৯৮০ এর দশকে দেশভাগ থেকে শুরু করে , ১৯৯২ সালের অযোধ্যার বাবরি মসজিদ
ধ্বংসের দিকে চালিত হয়। এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে লেখক কেন্দ্রবিন্দুতে না আনলেও তুমি সেইসব লক্ষ লক্ষ মানুষদের,
বিদ্রোহের হিসাব রেখেছেন যা তার বইয়ের চরিত্র গুলোর মন কে বিধ্বস্ত করে দেয়। জীবন ওলট পালট হয়ে যায়, পরিবার ভেঙে যায়,
জনসেবার ভয়ে জর্জরিত হয়ে পড়ে। আমরা দেখি ১৯৮০,৯০ দশকে নারী বাদী আন্দোলন মিস চিতল কে এমন একটা জীবন,
এনে দেয় যা তাদের পূর্বসূরীরা ভাবতে পারেনি। “রেল সং” এর মত একটি কাল্পনিক কাহিনীর এর জন্য শুধু কল্পনা প্রবন দুঃ সাহস নয়,
বরং অদম্য শৃঙ্খলার প্রয়োজন। ভট্টাচার্য্য উভয় ক্ষেত্রেই ভারতের স্বচ্ছ রূপকল্পে পৌঁছানোর জন্য তার অপেক্ষা সার্থক হয়েছে।
যা অপ্রত্যাশিত দয়া নিষ্ঠুরতা দ্বারা যেমন আবর্তিত ঠিক তেমন ছিন্ন ভিন্ন থাকে।

